মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের প্রেমে পড়েছিলেন কবি নির্মলেন্দু গুণ


DBkhobor24 প্রকাশের সময় : এপ্রিল ৭, ২০২২, ১২:৪৭ AM /
মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের প্রেমে পড়েছিলেন কবি নির্মলেন্দু গুণ

মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের প্রেমে পড়েছিলেন কবি নির্মলেন্দু গুণ

মোঃ রাসেল হাসান

”তোমার চুলে-চোখে, ঠোঁটে-স্তনে,
নিতম্বে-গ্রীবায়
ছিলো সুন্দরের সুষম বণ্টন।

তোমার কণ্ঠস্বরে ছিলো মধু
হাসিতে হিল্লোল,
আর ক্রন্দনে মৃত্যুর হাহাকার।

আমার যৌবনে
তুমি ছিলে প্রিয়ার প্রতীক।
প্রেমের প্রকর্ষে, কামের দহনে
আমি তোমাকে পেয়েছি স্বপ্নে,
আলিঙ্গনে, বারবার।

হে প্রেম জাগানিয়া বঙ্গের উর্বশী,
হে চিরযৌবনা, চিরঅধরা আমার;
এই চিরবিরহী কবির
অনাশ্রিত প্রেমের অঞ্জলি-
তুমি নাও।”

উপরোক্ত কবিতাটি আমার স্বপ্নের কবি নির্মলেন্দু গুণ ২০০৪ সালে মহানায়িকা সুচিত্রা সেনকে নিয়ে রচনা করেন। ১৯৬২ সাল। কবি এসএসসি পাস করে ময়মসিংহের আনন্দমোহন কলেজে ভর্তি হলেন। নিয়মিতই কবি ‘অলকা’ সিনেমা হলের ফ্রন্ট স্টলে বসে সিনেমা দেখেন।

এসময় সুচিত্রা সেন অভিনীত পথের হলো দেরি এবং সাগরিকা’সহ আরো গুটিকয়েক সিনেমা দেখে এই চিরযৌবনা নায়িকার প্রেমে পড়ে যান তিনি। এর আগে এসএসসি পরীক্ষার আগে ছুটি পেয়ে কবি তাঁর বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ঢাকায় বেড়াতে গিয়েছিলেন। পারিবারিক শাসন থেকে সাময়িক স্বাধীনতা পেয়ে নারায়নগঞ্জের ডায়মন্ড সিনেমা হলে ‘মহল’ সিনেমাটির নাইট-শো দেখেন। ওই সিনেমার জুটি ছিল অশোক কুমার ও মধুবালা।

মুভিটিতে ‘আয়ে গা আয়ে গা’র মতো একটি গানের মাধ্যমে মধুবালা বারবার অশোকের হৃদয়ে হানা দিচ্ছিলেন। অভিনবভাবে মধুবালা অশোকের চেয়ে কবি গুণ এঁর হৃদয়েই বেশি হানা দিচ্ছিলেন, তাও আবার বাস্তবে। পর্দায় দেখেই কবি প্রেমে পড়ে যান মধুবালার। সময়ের পরিক্রমায় এক বছর পরই কবির হৃদয়ে হানা দেন এক নতুন উর্বশী, উদিত হয় নতুন প্রেমের। নূতন প্রেমাজালে বন্দি হয়ে কবির প্রেমকানন থেকে মুছে যায় মধুবালার নাম।

কবির মনে ও মননের ক্যানভাসে এখন চিরসবুজ মহানায়িকা সুচিত্র সেনের ছবি ঘুরে বেড়ায়। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, শতশত মাইল দূরের এই নায়িকাকে পর্দায় দেখেই কবি তাঁর প্রেমে পড়ে যান। এই নায়িকা বয়সেও ছিলেন কবির চেয়ে চৌদ্দ বছরের বড়। এতেই বুঝা যায় যে, প্রেম কোনো বয়স মানেনা, দূরত্ব মানেনা। ২০১৯ সালে বাংলাদেশী কোনো টেলিভিশনে এক বালিকাকে দেখে আমিও দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম। বহু চেষ্টা ও তপস্যার পরও তার দেখা পাইনি। মুঠোফোনেও কথা বলতে পারিনি। এ যাবত তাকে নিয়ে সত্তরটিরও বেশি কবিতা রচনা করেছি। করে চলেছি।

কবি নির্মলেন্দু গুণের মনে আছে কিনা জানিনা, গত একুশে বইমেলাকে সামনে রেখে এই নন্দিনীকে নিয়ে লেখা কবিতাগুলো দিয়ে একটি বই প্রকাশ করার কথা ভাবছিলাম। কবির কাছে বইটির ভূমিকা লিখে দিতে আবদার করলে তিনি সম্মতি দিয়েছিলেন। পরে আর করা হয়নি। তবে করব একটু দেরিতে হলেও। সম্প্রতিও খুব চারু এক শিক্ষিকার প্রতি ভীষণ রকম দুর্বল হয়ে পড়েছি। হলেও এবং প্রেমে বহুবার বহু বালিকাদের পড়লেও প্রথম প্রেমের অঞ্জলী তাকেই দিয়েছি। হোক না একপাক্ষিক, হোকনা আমার লেখার মাঝেই, আমার মাঝেই। বইটির সারমর্ম জেনে কবির বোধহয় তাঁর সুচিত্রা সেনের কথা মনে পড়ছিল। ও আচ্ছা তাকে নিয়ে একটি নাটকও লেখা হয়েছে।

ভালো পরিচালক পেলে এর কাজটা করানো ইচ্ছে আছে। যাহোক, কবি নির্মলেন্দু গুণের লেখা ‘সুচিত্রা সেন’ শীর্ষক শিরোনামের কবিতাটি অন্তভূক্ত আছে এমন একটি কাব্যগ্রন্থ (বইটির নাম মনে নেই) কলকাতার কবি সমরেন্দ্র সেনগুপ্তের কাছে দিয়েছিলেন তাঁর প্রিয়তমা সুচিত্রার নিকট পৌঁছানোর জন্য। পরবর্তীতে সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত কবিকে জানান, বইটি একজন সাংবাদিকের কাছে তিনি দিয়েছিলেন। সুচিত্রার সাথে ওই সাংবাদিকের বেশ সখ্যতা রয়েছে এবং সাংবাদিক নায়িকার দৃষ্টিতেও কবিতাটি আনেন। মহানায়িকা কবিতাটি পড়ে হেসে কণ্ঠ থেকে নিঃসৃত করেন একটি শব্দ- ‘দুষ্টু’।

সুচিত্রা যখন পড়ছিলেন, “এই চিরবিরহী কবির অনাশ্রিত প্রেমের অঞ্জলী- তুমি নাও” তখন কি কবির প্রেমের অঞ্জলী গ্রহণ করেছিলেন তিনি? মুখের ভাষায় দুষ্টু বলে বুকের ভাষায় ‘গ্রহণ করেছি তোমার ভালোবাসা কবি গুণ, গুণ করেছি ভালোবাসা তোমার” বলতেও তো পারেন। সেটা একমাত্র মহা ঐশ্বরিয়ায় জানেন।

এ বিষয়টা তব আমাদের কাছে রহস্যঘেরাই রইলো। গ্রহণ না করলেও কবির ঈষৎ আশা নিশ্চয়ই পুরণ হয়েছে তাঁর স্বপ্নের নায়িকা, তাঁর স্বপ্নের প্রেমিকা তাঁর কবিতাটি পাঠ করা এবং পাঠ করে হাসির মধ্য দিয়ে। কবিরা এমনই। যে ললনাটা তাঁকে চিনেইনা তাঁকে নিয়েও নিভৃতে স্বপ্ন দেখতে দেখতে আর স্বপ্নকে লালন করতে করতে এভারেস্টসম করে তুলেন। জীবন সায়াহ্নে গিয়ে বিনিময়ে পান একটি হাসি, একটি শব্দ অথবা শূন্যতা, মহাশূন্যের শূন্যতা।
অনেক আগে প্রণম্য কবি নির্মলেন্দু গুণের কোনো একটি গ্রন্থেই এই কাহিনীটি পড়েছিলাম। আমি তাঁর মতো নিশ্চয়ই উপস্থাপন করতে সক্ষম হইনি।

আজকের প্রথম প্রহরে সুচিত্রা সেনকে নিয়ে ফেসবুকে তাঁর জন্মদিন সংক্রান্ত কারো পোস্ট দেখে কাহিনীটির কথা মনে পড়ল। উপাখ্যানটি আবার পড়ার জন্য খুব ইচ্ছে জাগলেও বইটির নাম মনে না থাকায় পারিনি। সম্ভাব্য কয়েকটা গ্রন্থেও খুঁজেছি, পাইনি। কবি নিশ্চয়ই লেখাটি দেখবেন, পড়বেন। লেখাটিতে কোনো ভুল থাকলে এবং আপনার কোন বইএ উপাখ্যানটি আছে মনে থাকলে আশাকরি জানাবেন।

১৯৩১সালের আজকের এই দিনে সুচিত্রা সেন জন্মগ্রহণ করেন। ২০১৪সালের ১৪ই জানুয়ারি তিনি পৃথিবী থেকে অসীমের পথে পাড়ি জমান। তাঁর মহাপ্রয়াণে নিশ্চয়ই কেঁদেছে কবি গুণ এঁর মন, ব্যথিত হয়েছে হৃদয়।

আজ ৬ই এপ্রিল বঙ্গের উর্বশী মহানায়িকা সুচিত্রা সেন এঁর ৯২তম জন্মদিনে তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। ওপারে ভালো থাকুক কবির না হওয়া প্রেমিকা।

লেখক- মোঃ রাসেল হাসান হাসান- কবি