“প্রাথমিক শিক্ষায় সহপাঠ ক্রমিক কার্যাবলির গুরুত্ব”


DBkhobor24 প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ২০, ২০২২, ৯:৫৯ PM /
“প্রাথমিক শিক্ষায় সহপাঠ ক্রমিক কার্যাবলির গুরুত্ব”

“প্রাথমিক শিক্ষায় সহপাঠ ক্রমিক কার্যাবলির গুরুত্ব”

লেখক- মো: মাহবুব হাসান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার জলঢাকা, নীলফামারী।

পূর্বে শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীর বৌদ্বিক বিকাশ। বর্তমানে বা আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা যুগের সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষার্থীর সর্বাঙ্গীন বিকাশে গুরুত্ব দিচ্ছে। সময়ের সাথে মানুষের চিন্তা ভাবনার ও অনেক পরিবর্তন ঘটে। তাই শুধু শিক্ষার্থীর বৌদ্ধিক বিকাশের পরিবর্তে শিক্ষার্থীর সর্বাঙ্গীন বিকাশকে শিক্ষার উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহন করা হয়।

শিক্ষাবিদরা মনে করেন যে, কেবল শিক্ষার্থীর সামগ্রিক ব্যক্তিত্বের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীর সামগ্রিক ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটাতে হবে। তাই পাঠক্রমে খেলাধুলা, নৃত্যগীত, শিক্ষামূলক ভ্রমন, সমাজসেবা, কবিতা আবৃত্তি, উপস্থিত বত্তৃতা, শরীর চর্চা ইত্যাদি কর্মমূলক প্রচেষ্ঠাকে অন্তভর্ক্ত করা হয়েছে। যাতে এর মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী সর্ম্পুন সুযোগ্য নাগরিক পরিনত হয়।

সহপাঠ ক্রমিক কার্যাবলি: সহপাঠ ক্রমিক কার্যাবলি বলতে বুঝায় পাঠ্য বইয়ের সাথে-ধুলা, নৃত্য, শরীর চর্চা, শিক্ষামূলক ভ্রমন, সমাজসেবা ইত্যাদিকে বুঝায়।

এইচ,এন বিভলিন নামে একজন মনোবিদ বলেছেন, যেসব কার্যাবলি শিক্ষার্থীর বৌদ্ধিক বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে জীবন বিকাশের অন্য দিকগুলোকেও সার্থক করে তোলে, তাদের বলা হয় সহপাঠ-ক্রমিক কার্যাবলি।

সহপাঠক্রমিক কার্যাবলির বৈশিষ্ট্য:

(০১) সহপাঠ ক্রমিক কার্যাবলির শিক্ষার্থীর সর্বাঙ্গীর বিকাশে সহায়ক হয়। শিক্ষার্থীরা সহপাঠ ক্রমিক কার্যাবলিতে অংশ নিলে তাদের দৈহিক, মানসিক, সামাজিক প্রাক্ষোভিক, নৈতিক বিকাশ হয়। তারা বিভিন্ন ধরনের পরিবেশে মানিয়ে নিতে শিখে।

(০২) সহপাঠক্রমিক কার্যাবলি দৈনন্দিন বাঁধাধরা পুথিগত শিক্ষার কাজ থেকে শিক্ষার্থীদের মুক্তি দেয়। তাদের মধ্যের একঘেয়ামি দূর করে।

(০৩) সহপাঠ ক্রমিক কার্যাবলি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের কাজের প্রতি-আগ্রহ সৃষ্টি করে। বহু-শিক্ষার্থী সহপাঠ ক্রমিক কার্যাবলিতে অংশগ্রহনের তাগিদে বিদ্যালয়মুখি হয়।

(০৪) বহু শিক্ষার্থীর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের সৃজনশীল গুন সুপ্ত অবস্থায় থাকে। সহপাঠ ক্রমিক কার্যাবলিতে অংশ নেওয়ার মধ্যে দিয়ে ওই সমস্ত গুনের বিকাশ ঘটার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

(০৫) বিভিন্ন শিক্ষার্থীর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের চাহিদা লক্ষ করা যায়। সহপাঠ ক্রমিক কার্যে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহন করলে শিক্ষার্থীরা একদিকে যেমন আনন্দ পায়, অন্যদিকে তাদের বিশেষ চাহিদাও পূরণ হয়।

(০৬) সহপাঠক্রমিক কার্যালিতে দলগতভাবে অংশগ্রহনের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মূল্যবোধের পরিপূর্ণ বিকাশ হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা দায়িত্বশীল ও সমাজ সচেতস ব্যক্তিতে পরিনত হওয়ার সুযোগ পায়।

(০৭) সহপাঠ ক্রমিক কার্যাবলির শিক্ষামূলক গুরুত্ব বা উপযোগীতা নিয়ে আধুনিক শিক্ষাবিদদের মধ্যে তেমন কোন মতবিরোধ নেই। নিচে সহপাঠক্রমিক কার্যাবলির শিক্ষামূলক গুরুত্ব আলোচনা করা হলো-

(০৮) সহপাঠক্রমিক কার্যাবলির শিক্ষার্থীর চাহিদার পরিতৃপ্তিতে বিশেষভাবে সাহায্যে করে থাকে। শিক্ষার্থীর চাহিদা ও প্রবনতা অনুযায়ী সহপাঠ ক্রমিক কার্যাবলি নিদিষ্ট করা হয়।

(০৯) সহপাঠক্রমিক কার্যাবলির যথাযথ সংগঠনের ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহযোগীতা, সমবেদনা, ভ্রাতৃত্ববোধ, পারষ্পরিক বোঝাপড়া প্রভূতিগুনের বিকাশ ঘটে যা প্রতিটি সমাজের পক্ষে বিশেষ প্রয়োজনীয়।

(১০) সহপাঠ ক্রমিক কার্যাবলি ব্যক্তি এবং সমাজের মধ্যে সংযোগ সাধনের কমিটি ত্বরান্বিত করে।

(১১) সহপাঠ ক্রমিক কার্যাবলি সর্বদাই শিক্ষার্থীকে আনন্দ এবং তৃপ্তি দেয়। শিক্ষার্থীর কাছে আনন্দদায়ক নয় এমন সব কাজকে সহপাঠ ক্রমিক হিসেবে বিবেচিত করা হয় না।

(১২) বিভিন্ন রকমের সহপাঠ ক্রমিক কার্যাবলি শিক্ষার্থীদের মধ্যে জাতীয় সংহতি বা জাতীয়তাবোধের বিকাশে সহায়ক হয়।

(১৩) কয়েকটি সহপাঠক্রমিক কাজ শিক্ষার্থীদের মধ্যে আন্তর্জাতিকতাবোধের বিকাশে সহায়ক হয়।

(১৪) শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সহপাঠক্রমিক কার্যাবলি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। শিক্ষার্থী যে বিষয়ে দক্ষ সেই বিষয়গুলোতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে সে নিজেকে নতুন ভাবে আবিষ্কার করার সুযোগ পায়।

(১৫) সহপাঠক্রমিক কার্যাবলি শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় জীবনের গতানুগতিকতা থেকে মুক্তি দেয়। বিভিন্ন সৃষ্টিশীল বিনোদনমূলক ক্রীড়ামূলক অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে বিদ্যালয় তাদের কাছে এক আনন্দ নিকেতন হয়ে ওঠে।

(১৬) সহপাঠক্রমিক কার্যাবলি প্রতিটি কাজ সম্পাদন করতে গেলে শিক্ষার্থীদের কিছু নিয়ম-কানুন মানতে হয়।

(১৭) বিদ্যালয়ের সহপাঠক্রমিক কার্যাবলির মাধ্যমে অনেক সময় বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করা হয়। শিক্ষার্থীরা সেই সমস্ত বৃত্তি প্রশিক্ষন নিয়ে বার বার সেগুলি অনুশীলন করে। তারা এই শিক্ষাগুলি এমনভাবে আয়ত্ত করে যে, তা কোন কোন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ জীবনের জীবিকা অর্জনের সহায়তা করে।

(১৮) বিদ্যালয়ে যারা প্রত্যক্ষ বা সক্রিয়ভাবে সহপাঠক্রমিক কাজে অংশগ্রহন করে, তাদের অবসর যাপনের অসুবিধা হয় না। তারা সমাজ স্বীকৃত পথে যথাযথভাবে অবসরের সময় কাটাতে পারে।

এসব দিক বিবেচনা করে বলা যায় একজন শিক্ষার্থীকে আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সহপাঠ ক্রমিক কার্যাবলি অন্যতম প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। তবে তা বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষককে তৎপর থাকবে হবে। যেন সহপাঠ ক্রমিক কার্যাবলি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ক্লাসের পড়ালেখার ঘাটতি না হয়।